প্রিন্সিপাল এএফএম গোলাম কিব্রীয়া এবং মায়ের ইন্তেকাল

(স্মৃতির পাতা থেকে)

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

এএফএম গোলাম কিব্রীয়া স্যার ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি কালিহাতির আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। স্বাধীনতার পরপরই কালিহাতির অদুরে নোয়াবাড়ীতে জনতা কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। কয়েক মাস চলার পর কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৩ সনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার কলেজটি তার বাড়ী ছাতিহাটির কাছে আউলিয়াবাদে স্থানান্তরিত করে তার দাদার নামে নামকরন করেন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ। বহু বছর আগে গ্রামটির নাম ছিল ভন্ডেশ্বর। সেখানে বাজার সংলগ্ন একটি বিরাট পতিতালয় ছিল। এক সময় পতিতা উচ্ছেদ করে গ্রামের নাম দেয়া হয় আউলিয়াবাদ। গ্রামের উত্তর অংশে এক আউলিয়ার মাজার আছে। আলাউদ্দিন কলেজ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই আব্দুল লতিফ সিদ্দকী স্যার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নেন। সেই সময় ভোলা জেলা নিবাসী এএফএম গোলাম কিব্রীয়া নামে একজন সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন। তিনি লতিফ সিদ্দিকী স্যারের একজন অন্যতম পছন্দের মানুষ ছিলেন। কলেজটি আবাসিক ছিল। ছাত্রদেরকে করা শাসনের ভিতর রাখা হত।তাই তাদের রেজাল্ট ভাল হত। কলজের সাথে একটি কৃষি খামার ছিল। ছাত্রদেরকে রুটিন অনুযায়ী দিনের কিছুক্ষণ কৃষিকাজ করতে হত। এলাকার জনগনের কাছে কলেজটির বেশ কদর ছিল।

১৯৭৫ সনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের জন্য লতিফ সিদ্দিকী স্যার অনেক বছর ভারত ও রাশিয়া অবস্থান করেন। নয় মাস কলেজ বন্ধ থাকার পর প্রবাস থেকে স্যারের নির্দেশনায়, স্যারের চাচা জনাব ওয়াদুদ সিদ্দিকী (হুদ্দু মিয়া) সাহেবের তত্বাবধানে কলেজটি আবার চালু হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হন বল্লার মোসলেম উদ্দিন স্যার। সব স্যারের ঐকান্তিক চেষ্টায় কলেজটির লেখাপড়ার পরিবেশ আগের মত রাখার চেষ্টা করা হয়।

এই কলেজে আমি ভর্তি হই ১৯৭৭ সনে। ছাত্র সংখ্যা কম থাকাতে এবং সরকারী অনুদান কম আসাতে কলেজটি আর্থিক সংকটে পরে। কয়েকজন টিচার চলে যান। আমি দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসের ইট টুকিয়ে টুকিয়ে বিক্রি করে সেই টাকায় স্যারদের বেতন দিতে হতো। আমরা কলেজের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ডিসেম্বরের দিকে স্যারদের কাছে শুনলাম কিব্রীয়া স্যার নামে আগে এক প্রভাষক ছিলেন তিনি প্রিন্সিপাল হয়ে আসছেন। তিনি আসলে অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি জানুয়ারির দিকে আসলেন। অদ্ভুত এক ধরনের মানুষ তিনি। তিনি সব সময় খাকি রংগের কুরতা পরতেন। দেখতে ঠিক যুবক বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মত। মাথায় ঠিক জাতীয় কবির মত ঝাকরা চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। স্বল্পভাষী। মৃদুভাষী। কথা বলার সময় মনে হয় যেন অনেক্ষণ মন খারাপ করে ছিলেন। কান্না কান্না গলার স্বর। অল্প বলতেন। কিন্তু মুল্যবান কথা বলতেন। সব টিচার তাকে পীরের মত মানতেন। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আমাদের ক্লাসমেট দুলালের মাকে বোনের মত মানতেন। তাই দুলাল তাকে মামার মত মনে করতেন। দুলাল আমাদের কাছে বলতো "প্রিন্সিপাল মামা এই বলেছে। প্রিন্সিপাল মামা এই করেছে। " যেহেতু মামা হয় সেহেতু স্যারকে দুলাল ভয় পেতো না। তাই দুলালের গর্ব ছিল। পরিচিতি অনুষ্ঠানে স্যার আমাদেরকে অনেক ধর্মীয় ও নৈতিক কথা শিক্ষা দিয়েছিলেন। তার একটা আমি উল্যেখ করতে চাই। স্যার বললেন "মৃত্তুর পর বিচার হবে। ভাল কাজের পুরুস্কার দিবেন। মন্দ কাজের শাস্তি হবে। কঠিন শাস্তি। বিশ্বাস কেউ করতে পার কেউ না করতে পার। যারা বিশ্বাস করছ তারা নিশ্চিত না। যারা করছনা তারাও নিশ্চিত না। বিচার না হলে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু যদি বিচার হয়! তখনকি উপায় আছে? উপায় নাই। কাজেই বিচার হবে এই বিশ্বাসের উপর থাকতে হবে। "

২১ শে ফেব্রুয়ারি ও ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে স্যারের পারদর্শিতার বেশ কিছু প্রমান পেলাম। আমাদের কলজের পিছনে বাশের তৈরি এক লাইনে ১০ /১২টি কাচা লেট্রিন ছিল। ৮/১০ দশ ফুট উপর থেকে খোলা গর্তে পায়খানা পরত। ছাত্র শিক্ষক সবাইকে এইগুলি ব্যবহার করতে হতো। কিব্রীয়া স্যার প্রথমেই এইগুলির পরিবর্তে ১০/১২টি পাকা সেনিটারি লেট্রিন তৈরি করলেন এবং কয়েকটি টিউব ওয়েল বসালেন সরকারী অনুদান এনে। অল্পদিনের মধ্যে কয়েক লাখ টাকা সেংশন করিয়ে টিচারদের জন্য ডর্মেটরি বিল্ডিং নির্মান করালেন। পুকুর সংস্কার করে মাঠ সমতল করালেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এনে কলেজ পরিদর্শন করালেন। ছাত্রশিক্ষকদের কর্মস্পৃহা দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। ফিরে গিয়ে কলেজের জন্য অনেক সরঞ্জামাদি বরাদ্দ দিলেন। প্রিন্সিপাল স্যারের অনুরোধে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজকে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসাবে অনুমোদন দিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব এসেছিলেন কালিহাতি হাই স্কুল মাঠে জন সভায়। বিরাট এক ব্যানার নিয়ে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজ থেকে আমাদের সব ছাত্র পাঠিয়েছিলেন উক্ত সভায়। মাঠের মাঝখানে এতগুলি ছাত্রের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রেসিডেন্ট-র দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি কয়েকলাখ টাকা কলেজের জন্য মঞ্জুরি দিতে নির্দেশ দেন। এরপর কলেজের অবস্থা অনেক পাল্টে যায়। ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে কিব্রীয়া স্যার আমাদের ব্যাচের হোস্টেলে থাকা ছাত্রদের নিয়ে বিকেলে ছাতিহাটি গেলেন। কলেজের নামে এলাকায় অনেক ধানী জমি ছিল। সেই জমিতে ইরি ধানের জালা বা গাছি ফেলা ছিল। স্যার আমাদের নিয়ে সেই জালা তুলতে বসলেন। আমরা ছাটা কামলার মত স্যারের সাথে লাইন ধরে বসে জালা তুললাম। এক সময় আমি, নজরুল বেলায়েত, কাদের, বুলবুল সবাই মিলে ছাটা কামলাদের মত আঞ্চলিক ভাষার গান গাইলাম। স্যার নিরবে উপভোগ করছিলেন। আমরা স্যারকে ভয় বা লজ্জা পেলাম না। স্যার বললেন "উন্নত দেশে কোন কাজকে কেউ ছোট করে দেখে না। পড়াশুনার ফাকে ফাকে তারা কাজ করে।" এভাবে আমরা মাঝে মাঝেই এক ঘন্টা বা আধ ঘন্টা কাজ করতাম। কাজের শেষে বিস্কুট খেতাম। স্যার আমাদেরকে হোস্টেলে করা শাসনের ভিতর রাখতেন। বেলা ডোবার সাথে সাথে রুমে ফিরতে হত। রাত ১২টার মধ্যে লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পরতে হত। শিক্ষকগণও স্যারকে পীরের মত মানতেন। তিনি দৈনিক তিন/চারটি করে ডিম পুচ করে খেতেন। তাই স্যারের একটু মোটাসোটা ছিলেন। কুরতা পরাতে তেমন চোখে পড়ত না।

১৯৭৯ সনে আমাদের কলেজে প্রথম পরীক্ষার সেন্টার হল আমাদের এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে। ২৯ শে মে বৃ্হস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা দিলাম। ৩১ মে শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্র হল। ২ জুন সোমবার ইংলিশ প্রথম পত্র পরীক্ষা দিয়ে খেয়ে হোস্টেলে ঘুমালাম। পায়ের আওয়াজে ঘুম ভেংগে গেল। চোখ মেলে দেখি আমার এক বছরের বড় আমার চাচাত ভাই পাশের বাড়ীর জিন্না ভাই। দেখেই বুঝে ফেললাম জিন্না ভাই খুব একটা সাংঘাতিক খারাপ সংবাদ নিয়ে এসেছেন। পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে মায়ের দোয়া নিতে বাড়ী গিয়েছিলাম। মাকে খুব অসুস্থ দেখেছি। হাল্কা হাল্কা জ্ঞান ছিল। বাঁচবে বলে মনে হয় নি। হয়ত মা আজ নেই। জিন্না ভাই বললেন "তোমাকে বাড়ী যেতে হবে এখনি। কাক্কি হয়ত বাচবে না। সাথে তোমার মশারিটা নিয়ে যেতে বলেছেন।"

আমি যখন হোস্টেলে উঠার জন্য নতুন মশারি কিনি মশারিটি দেখে আমার অসুস্থ মা বলেছিলেন "আমি এবার হয়ত আর বাচব না। আমি মরে গেলে এই মশারি বেধে ধোয়াইও।" এই কথা লাইলি বুবু ও ভাবী শুনেছিলেন। আমার আর বুঝতে দেরী হল না যে মা নেই।

আমি প্রিন্সিপাল কিব্রীয়া স্যারের কাছে গিয়ে বললাম

: স্যার, মা মারা গেছেন। আমি বাড়ী যাচ্ছি। "
: কে বলেছে?
: আমার চাচাত ভাই এসেছেন।
: অখিল বাবু, ওর ভাইকে এখানে নিয়ে আসুনত। জিন্না ভাই আসলে আমাকে রুমে যেতে বললেন। আমি রুমে গিয়ে রেডি হয়ে গেলাম। স্যার অখিল চন্দ্র নাথ স্যারকে নিয়ে আমার কাছে আসলেন। অখিল স্যার ছিলেন আমাদের ফিজিক্যাল ইন্সট্রাকটর। স্যার আমাকে বললেন "মা বাবা সবার বেচে থাকে না। হয়ত তোমার মা বেচে নেই। মন ভাংবে না। অখিল বাবু তোমাকে বাইসাইকেলে ডাব্লিং করে বাড়ী নিয়ে যাবে। যদি তোমার মা ইন্তেকাল করেই থাকেন তবে তাকে দাফন করে অখিল বাবুর সাথেই এসে পরবে। আগামীকাল পরীক্ষায় বসবে। মা মরে গেলে মা আর পাবে না। পরীক্ষা বাদ দিলে জীবনে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। "

আমি নিরবে সাইকেলে অখিল স্যারের সামনে বসলাম। আমি তখন হাল্কা পাতলা হলেও ওজন আমার ৫৬ কেজির কম ছিল না। এই আমাকে নিয়ে অখিল স্যার সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ের দুর্গম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাদছিলাম। ভন্ডেশ্বর, খালুয়া বাড়ী, আওলাতৈল, মরিচা, বাঘেরবাড়ী, দেবলচালা, সিরিরচালা, ঢ্নডনিয়া, জিতাশ্বরি, নওপাড়া সুদীর্ঘ ১২/১৩ কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে রাত ১০ টার দিকে বাড়ী পৌছলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল জানাজার জন্য। আমি অজু করে জানাজায় শরীক হলাম। দাফন হল। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

সকালে ফজরের নামাজ পড়ার পর অখিল স্যার বললেন "কিব্রীয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষা শুরুর আগেই ফিরিয়ে নিতে বলেছেন। " আমি বললাম "চলুন। " কাক্কি (হাসেন কাক্কুর স্ত্রী) বললেন "ও এবার জৈষ্ঠ মাসে আম দুধ খায় নাই। একটু দাড়ান সামান্য আম দুধ খাক।" আমি আম দুধ খেয়ে সাইকেলে বসলাম। পরীক্ষা শুরুর আধ ঘন্টা আগে গিয়ে পৌঁছলাম। মুখ ধুলাম। আবুল হোসেন স্যার এগিয়ে এলেন। বললেন "কিব্রীয়া স্যার তোমাকে পরীক্ষার হলে যেতে বলেছেন।" আমি নিরবে হলে গিয়ে বসলাম। হাতে খাতা ও প্রশ্ন পত্র দেয়া হল। দোয়া পড়ে লিখা শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ লিখার পর মায়ের স্মৃতি ভাসা শুরু হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরা শুরু হল। কোন এক স্যার মাথায় হাত বুলালেন। আমি আবার লিখলাম। লিখে শেষ করলাম। রুমে ফিরলাম। সবাই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে শান্তনা দেবার মত সময় সবার হাতে কম। আমিও বুঝলাম। ভাগ্যের নির্মম অধ্যায় অতিক্রান্ত করছিলাম।

কয়েকদিন পর বাবা আসলেন হাসেন কাক্কুকে সাথে নিয়ে। বাবার চেহারা দেখে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম। বাবার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। ভয় হল বাবাকেও হারাই নাকি। বাবা প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে দেখা করতে চাইলেন। আমি হাসেন কাক্কু ও বাবাকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে নিয়ে রেখে আসলাম। কয়েকদিন পর ভিয়াইল থেকে রশিদ কাক্কু আসলেন বর্গার বছির মৌলবী সাহেবকে নিয়ে আমাকে দেখতে। আমাদের বংশের অর্ধেক লোক আদি বাড়ী ভিয়াইল থাকেন। রশিদ কাক্কুও স্যারের সাথে দেখা করে স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসেন কাক্কু, বাবা ও রশিদ কাক্কু কিব্রীয়া স্যারের আতিথেয়তার প্রশংসা করতেন। এইচএসসি পাস করি আল্লাহর দয়ায় প্রথম বিভাগে ২টি লেটার নিয়ে। স্যারের সাথে দেখা করে কদম্বুচি করি। তারপর ১৯৯৪ এর আগ পর্যন্ত স্যারের সাথে দেখা হয় নাই। এর মধ্যে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী স্যার দেশে ফিরে কলেজের দায়িত্ব হাতে নেন। স্যার এক সময় চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যান। কিছুদিন ঢাকার কোন এক কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু আবার ছেড়ে ছলে যান বোনের বাড়ী পটুয়াখালী। মাঝে মাঝে তিনি আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে বেড়াতে যেতেন। এক সময় শুনেছি সাগরদীঘীর কাছে কয়েকশ একর সরকারী জমি বন্দোবস্ত নিয়ে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহন করবেন। তা আর হয় নি।

১৯৯৪ সনে আমি এম ফিল পড়াকালীন ঢাকার শাহবাগে পিজি হোস্টেলে থাকতাম। একদিন হঠাৎ কিব্রীয়া স্যার আসলেন হোস্টেলে। জানতে পারলাম স্যারের বোনের বাড়ীর কাজের মেয়ের মাথার টিউমার দেখাতে পিজি হাসপাতালে এসেছেন। অল্প কথা হলো। চলে গেলেন। কয়েকদিন পর সন্ধায় আবার আসলেন। জানালেন কাজের মেয়ের মাথার টিউমার আজ অপারেশন হয়েছে। তিনি আজ থাকবেন। আমি বললাম "যদি আপনার কষ্ট না হয় আমার সীটে আপনি থাকেন, আমি পাশের সীটে থাকব।" স্যার থাকলেন। রাতে অনেক গল্প হল। নাম ধরে ধরে আমাদের ব্যাচমেট কে কি পাস করেছে, কি করছে সব জানতে চেষ্টা করলেন। আমি বেশ কয়েকজনের তথ্য দিতে পারলাম। এক সময় জানতে চাইলেন আমাদের এক বন্ধুর যে একটা সমস্যা হয়েছিল সেটার কি হল। আমি বলেদিলাম যে সেটা এইভাবে সমাধান হয়ে গেছে। তিনি বললেন যে এই সমস্যা না। আরেক সমস্যা। বলে তিনি আরেক সমস্যার কথা জানালেন। যেটা আমি জনতাম না। এইভাবে আমরা ভুলক্রমে বন্ধুর দুইটি গোপন সমস্যা উভয়েই জেনে গেলাম। সেই কথা মনে হলে হাসি পায়। কাউকে বলতেও পারিনা। বললে বন্ধু রাগ করবে। তারপরদিন স্যার চলে যান। আর স্যারকে দেখি নি। এটাই ছিল শেষ দেখা।

আমাদের ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই স্যারের প্রিয় ছিল স্যারের আলাপে বুঝা গেল। তাদের মধ্যে ডাঃ নজরুল ইসলাম এফ সি পি এস, চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ কন্সাল্টেন্ট, জেনারেল হাসপাতাল, টাংগাইল, ডাঃ নারায়ণ ও ডাঃ সদর উদ্দিন, এডি, একই হাসপাতাল, ডাঃ বেলায়েত, উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা, কালিহাতি, আমি ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার, এম ফিল(প্যাথলজি), বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ, ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল হক ও লুৎফর রহমান বুয়েট থেকে পাস করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাফিউল্লাহ বুলবুল বিমানের প্রধান প্রকৌশলী, প্রফেসর ড. লুৎফর রহমান পিএইচডি, নাটক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠিত হওয়া আমাদের ব্যাচ ও অন্যান্য ব্যাচের অনেক ছাত্র আছে স্যারের।

এক সময় ঘাটাইল ব্রাম্মনশাসন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হলে প্রিন্সিপাল নিয়োগ নিয়ে সমস্যা হয়। এই সময় কিব্রীয়া স্যার আউলিয়াবাদ বেড়াতে আসেন। সেখান থেকে আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের ডেমনস্ট্রের লতিফ ভাই তাকে ব্রাম্মনশাসন নিয়ে যান। জোর করে প্রিন্সিপাল বানান। অফিসিয়ালি প্রিন্সিপাল হতে ইন্টার্ভিউ লাগে। কেউ তার ইন্টার্ভিউ নিতে ধৃষ্টতা দেখায় নি। ইন্টার্ভিউ পেপারে তাকে এমনি এমনি সুপারিশ লিখে দিয়েছেন। এখানে কয়েকবছর ছিলেন। একদিন দেশের বাড়ী বেড়ানোর কথা বলে আর ফিরে আসেন নি। তিনি বিছানাপত্র কাপড় চোপর কিছুই নেন নি।

অনেকদিন পর জানা গেছে পটুয়াখালী বোনের বাড়ী অবস্থান কালে চিরকুমার, মৃদুভাষী, বিচক্ষণ, স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিদীপ্ত সেই বড় মাপের মানুষটি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন। অনেকদিন যাবৎই ভাবছি স্যারে কথা কিছু লিখে যাই। কিন্তু লিখা আর হয় না। আমার মামা আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম ও উক্ত কলেজের ডেমনস্ট্রের আব্দুল লতিফ ভাই থেকে কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও কিব্রীয়া স্যারের আগে পরের ইতিহাস নিয়ে কিছুটা আইডিয়া নেই লিখার জন্য। আল্লাহ আমাকে অনেকগুলি বিশেষ দক্ষতার মধ্যে একটা দক্ষতা দিয়েছেন সেটা হল আমি বিশ্রামের সময় শুয়ে শুয়ে ও জার্নির সময় বসে বসে এন্ডয়েড মোবাইলে রিদমিক কিবোর্ড অভ্র দিয়ে ইংলিশ অক্ষর টিপে দ্রুত বাংলা টাইপ করতে পারি। তাই এই লিখাটি বিশ্রামের সময় লিখা সম্ভব হল। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে এই ভেবে যে এই আমি কি অখিল স্যারের ঋণ শোধ করেছি? আমি কি কিব্রীয়া স্যারের ঋণ শোধ করেছি? স্মৃতির পাতায় ঋণও লিখা আছে।


==
২১/১২/২০১৭

Google Ads


সুচিপত্র