মেডিকেলের ইরানী মেয়েটি

(ছোট গল্প)

ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

লেইলা ইরানী মেয়ে। ১২ বছর ধরে মেডিকেলে পড়ছিল। এই ১২ বছরে মাত্র এমবিবিএস ৪র্থ বর্ষ পর্যন্ত উঠেছিল। ইরানে "এ" লেভেল পর্যন্ত পড়ে বাংলাদেশে এসেছিল মেডিকেলে পড়তে। তার বাবা ইরানে সরকার বিরোধী কমুনিস্ট পার্টি করতেন। তাই তাকে জীবনের বেশীভাগ সময়ই জেলে কাটতে হয়েছে। বাবার সান্নিধ্য লেইলা খুব কমই পেয়েছে। লেইলারা ৫ বোন। পাঁচ সন্তান নিয়ে লেইলার মা খুব পেরেশানি করে সংসার চালিয়েছেন।

লেইলা এই ১২ বছরে মাত্র ২ বার ইরানে গিয়েছিল। তাও অল্পদিনের জন্য। মেডিকেলে পড়ার চাপে তাকে তাড়াতাড়িই ফিরে আসতে হয়েছে বাংলাদেশে। পড়াশুনা তার ভাল লাগে না। বাবার কথা মনে পড়ে। মায়ের কথা মনে পড়ে। প্রায়ই দেখা যায় বিকেলে একাকী কুমারী নদীর তীরে বসে বসে নানা রঙের পালতোলা নৌকা দেখছে। তার কোন বন্ধু নেই। কারো সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টাও সে করে নি। কেউ তার সাথে বন্ধুত্ব করতেও আসে নি। মাথায় একটা তিনকোণা ভাজ করা সিল্কের স্কার্ফ পড়ে থাকত সব সময় লেইলা। সে হোস্টেলে বেশীক্ষণ থাকত না। তাকে প্রায়ই দেখা যেত উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরাফিরা করতে। কোন কোন সময় দেখা যেত প্রেসক্লাব চত্তরে। আবার কোন কোন সময় নতুন বাজার। মাঝে মাঝে রিক্সায়। মাঝে মাঝে ফুট পাথ দিয়ে হেটে যেতে দেখা যেত। পরিচিতজন সামনে পরলে একটু মুস্কি হাসি দিত। তার কক্ষ প্রায় সময়ই তালা দেয়া থাকত। মেডিকেলের ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সে মাঝে মাঝে ক্লাসে এটেন্ড করত। পড়া শুনা না করলে বা ক্লাস না করলে মেডিকেল কলেজ থেকে বের করে দেয়ার কোন প্রভিশন ছিল না। পড়া না পারলে ফেল। লেইলা ফেল করে করে অথবা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ না করে সময় পার করে দিচ্ছিল।

লেইলা একাই এক রুমে থাকতো। প্রতি রুমে দুইজন ছাত্রী থাকার কথা ছিল। কিন্তু লেইলার রুমে অন্য কোন ছাত্রীর সীট এলটমেন্ট হলে তাকে সে সীটে ওঠতে দিত না। একবার সীট এলোটমেন্ট নিয়ে মহা সংকটে পরলেন হোস্টেল সুপার সাহেব। ধারন ক্ষমতার চেয়ে ছাত্র সংখ্যা কম ছিল। তারপরও সীটের সংকট। দুর্বলু দলের সাপোর্টার ছাত্ররা ভয়ে হোস্টেলের বাইরে মেসে থাকত। ছাত্রদের মাঝে প্রভাব খাটানোকে কেন্দ্র করে সীট সমস্যা দেখা দিল। অফিস থেকে এলটমেন্ট দেয়া হলে দেখা যেত সে তার সীটে ওঠতে পারত না। এই সংকট নিরসনের জন্য হোস্টেল সুপার প্রিন্সিপালের সহযোগীতা চাইলেন। প্রিন্সিপাল সাহেব সুপার, দুইজন সহকারী সুপার (একজন পুরুষ, একজন মহিলা) ও অফিস সহকারীকে নিয়ে হোস্টেল পরিদর্শনে গেলেন। তিনি লিস্ট দেখে যে রুমে যার সীট এলটমেন্ট হয়েছে সেই রুমেই তাকে উঠিয়ে দিলেন। সমস্যা হল লেইলার রুম নিয়ে। লেইলার রুমে কেউ সীট নিতে রাজি হল না। কারন হিসাবে দেখাল যে, লেইলার কারো সাথে বন্ধুত্ব নাই। তার রুমে কাউকে যেতে দেয় না। তার আচরনে অনেক সন্দেহ আছে। সে এখানে থেকে কোন বড় ধরনের বিদেশী এজেন্টের সাথে কাজ করে যাচ্ছে কিনা সন্দেহ। প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন


: লেইলা আবার কে?
: স্যার, ইরানী পাগলী মেয়েটি। পড়াশুনা না করে সারাদিন ঘুরাফিরা করে।
: কোথায় সে?
: তার কি কোন ঠিক ঠিকানা আছে। মাঝে মাঝে রুমে আসে। তালা মেরে চলে যায়। তার রুমে কি আছে না আছে কেউ বলতে পারবে না।
: তালা ভাংগেন। আমি রুম দেখব। রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
: মেয়েটার অনুপস্থিথিতিতে তালা ভেঙে রুমে প্রবেশ করা ঠিক হবে?
: রাখেন ঠিক বেঠিক। ভাংগেন তালা। দেখব কি আছে ভিতরে।
: স্যার, আমাদের হাতে তালা ভাংগার কিছু নাই। রেল ষ্টেশন থেকে চাবি মিস্ত্রী নিয়ে আসি?
: যান, তাড়াতাড়ি করেন।

মিস্ত্রী এসে তালা ভাংলো। মেয়েদের রুম। তাই মহিলা সহকারী হোস্টেল সুপারকে আগে রুমে প্রবেশ করতে দেয়া হল। তার পিছনে প্রবেশ করলেন প্রিন্সিপাল সাহেব, তার পিছনে পুরুষ সহকারী সুপার। ভয়ে ভয়ে দরজা খোলা হল। ভিতরে গিয়ে লাইট অন করে দেখা গেল সবকিছু পরিপাটি, সুন্দর করে গোছানো। সাদা দব দবে বিছানা। খাটের পিছনে সুন্দর একটা পর্দা টানিয়ে পার্টিশন করা হয়েছে। মহিলা সহকারী সুপার পর্দা ফাক করে ভিতরে উকি দিয়ে চিৎকার দিয়ে মুর্ছা খেয়ে পড়ে গেলেন। ধরাধরি করে বাহিরে আনা হল। এবার বাকীরা এক যোগে পর্দা ফাক করে দেখতে পেলেন দেয়ালের সাথে গ্রীল দিয়ে খাঁচা বানিয়ে তার ভিতর একটা বিরাট বানর রাখা আছে। বানরটি অপরিচিত মানুষ দেখে দাঁত খিচিয়ে ক্রোধ প্রকাশ করা শুরু করল। জানাজানি হয়ে গেলো যে মেডিকেল হোস্টেলে এক বিদেশী ছাত্রী বানর পোষে।

প্রিন্সিপাল সাহেব অফিস সহকারী ও সুপারদের সাথে পরামর্শ করলেন কি করা যায়। একেকজন দর্শনার্থী একেক রকম মন্তব্য ছাড়লেন।


: কত মানুষই তো কত কিছু পালে। তাদের নিয়ে তো কেউ কিছু বলে না।
: মেয়েটা সখ করে একটা বানর পালছে তাতে সমস্যা কি?
: মেয়েটা একটা প্রাণীর প্রতি মায়া করে তাকে লালন পালন করছে। এতে দোষের কি আছে?
: বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃকোলে। বানরটাকে বনে ছেড়ে দেয়া হউক।
: বানরটা খাবার দাবার মনে হয় ভালই পেয়েছে, দেখেন কেমন নাদুসনুদুস।
: পেয়েছে মানে, খুব পেয়েছে। এই জন্যই দেখেছি মেয়েটি প্রায়ই বড় বড় সাগর কলা, আপেল ও বিভিন্ন ফল মুল নিয়ে আসতো। এখন বুঝলাম এই বানরটাকেই খাইয়েছে।
: কত মানুষ না খেয়ে আছে, আর ইনারা খাওয়াচ্ছে বানরকে।
: দেখো, দেখো, বানরটা কেমন মানুষের মত তাকিয়ে থাকে?
: মেয়েটাকে পুলিশে দেয়া দরকার।
: না না, বিদেশী মেয়ে।ভালো মেয়ে পুলিশে দেয়া ঠিক হবে না।

এমন সময় দেখা গেল পশ্চিম দিক থেকে লেইলা আসছে। রুমের সামনে ভিড় দেখে একটু ইতস্তত হল। প্রিন্সিপাল সাহেবকে সালাম দিল।
: কোন সমস্যা হয়েছে, স্যার?
: তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
: স্যার, একটু নতুন বাজার গিয়েছিলাম।
: এত বড় বড় কলা কে খায়?
: কেন স্যার, আমিই।
: রুমে বানর কেন?
: এটা আমার পোষা বানর।
: বানর কোথায় পেলে?
: সে অনেক কথা। আপনাকে পরে বলি স্যার?
: ঠিক আছে। আমি অফিসে গেলাম। তুমি অফিসে এসে বিস্তারিত বলবে।

লেইলা অফিসে গিয়ে বিস্তারিত বলল।

প্রায় তিন বছর আগে লেইলা দেখতে পেল নতুন বাজার মোড়ে আইল্যান্ডে গালে হাত দিয়ে বসে আছে এক লোক। আনুমানিক বয়স ২৫ বছর। তার এক কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসেছিল একটা বাচ্চা বানর। বানরও গালে হাত দিয়ে বসে ছিল। লোকটার চেহারা জীর্ণশীর্ণ। ময়লা একটা ছেড়া জামা গায়। সাথে একটা থলে, একটা ডুকডুগি, ও লাঠি। বানরটাও জীর্ণশীর্ণ। দেখে লেইলার মায়া হলো।
: তোমার নাম কি?
: বাংকু।
: বাংকু?
: আসল নাম ছিল বছির উদ্দিন। এখন পরিচয় দেই বাংকু বলে। বানরের খেলা দেখাই তো। তাই বানরের নামের সাথে মিলিয়ে বাংকু নামে পরিচয় দেই। বানরের নাম হলো মাংকু।
: তোমার বাড়ি কোথায়?
: আমার কোন বাড়ি ঘর নাই। সারাদিন ঘুরে ঘুরে খেলা দেখাই। রাতে স্কুল ঘরের বারান্দায় ঘুমাই।
: তোমার কে কে আছে?
: আমার কেউ নেউ। আমি বাবা ছাড়া সন্তান। ছোটবেলায় মা মারা গেছেন। আমি ঢাকার টোকাই ছিলাম। আমি এক সময় একটা মস্তবড় অন্যায় কাজ করে ঢাকা থেকে পালিয়ে গরাণ বনে লুকাই। সেখানে কিছুদিন বন্য ফলমুল খেয়ে জীবন বাঁচাই। এক সময় এই বানরের বাঁচ্চাটাকে লুকিয়ে এনে পালি। খেলা শিখাই। এখন খেলা দেখিয়ে দুইচার টাকা যা পাই তা দিয়ে দুইজনের পেট চলে।
: তুমি বিয়ে কর নাই?
: বিয়ে করে রাখব কোথায়?
: বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না?
: করে।
: আমি যদি তোমাকে অনেক টাকা দেই, যে টাকা দিয়ে তুমি একটা ছোট্ট ঘর বানাতে পারবে, একটা বিয়ে করতে পারবে, ছোট একটা দোকান দিতে পারবে, নেবে?
: আপনি এত টাকা আমাকে দিবেন কেন?
: বিনিময়ে তুমি তোমার বানরকে দিয়ে দেবে আমাকে।
: আপা, আপনাকে দেখে মনে হয় বিদেশী মেয়ে। আপনার অনেক দয়া। কিন্তু মাংকুকে আমি অনেক স্নেহ করি। অরে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।
: আমি মাংকুকে অনেক যত্নে রাখবো। ভালো ভালো খাবার দেব। তুমি মাঝে মাঝে দেখে যেতে পারবে।
: তাহলে নেন, আপা।

এরপর বানরটাকে একটা থলেতে ভরে লুকিয়ে হোস্টেলের রুমে আনা হয়। বড় সাইজের একটা খাঁচা বানিয়ে ওয়ালের সাথে আটকানো হয়। এই কাজটি ঈদের ছুটির সময় হোস্টেল ফাকা হওয়ার সুযোগে করে নেয় লেইলা। এত গেল বানর সংগ্রহের কাহিনী। পরদিন একাডেমিক কাউন্সিলের জুরুরি মিটং ডাকা হলো। সবার আলোচনার বিষয় ছিল বানর অবমুক্ত করন ও লেইলাকে মেডিকেল কলেজ থেকে বহিস্কার করা। সভায় সিদ্ধান্ত হল লাইলাকে বহিঃস্কার করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। বানরের ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নেয়া। প্রথম পদক্ষেপ হল থানায় জানানো।

প্রিন্সিপাল সাহেবের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি নিয়ে কলেজের অফিস সহকারী থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলেন। অভিযোগ নথিভুক্ত করা হল। পুলিশ পরিদর্শক এসে লেইলার কক্ষ পরিদর্শণ করে ও সি সাহেবের নিকট জমা দিলেন। ঘটনাটা তদন্ত করার জন্য প্রিন্সিপাল সাহেবকে অনুরোধ করলেন। পত্রিকায় বানর পাওয়া যাবার সংবাদ প্রচারিত হল। উর্ধতন অফিস থেকে প্রিন্সিপাল সাহেবকে ঘটনাটা তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হল।

প্রথম পদক্ষেপ হল বানর অবমুক্তকরন। প্রিন্সিপাল সাহেব পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেপুটি ডাইরেক্টর বরাবর বানর পোষার জন্য পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতির প্রয়োজন সংক্রান্ত মতামত চেয়ে চিঠি লিখেন। পরিবেশ অধিদফতর থেকে পরিদর্শক এসে সরেজমিন তদন্ত করে রিপোর্ট দেন যে হোস্টেল বানর পোষার জন্য অনুমোদিত নয়। বিনা অনুমতিতে তিন বছর বানর পোষার জন্য লেইলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হল। প্রিন্সিপাল সাহেব প্রাণী সম্পদ বিভাগকে লিখলেন বানরের স্বাস্থ্যগত ব্যাপারে তাদের মতামত দিতে । পশু চিকিৎসক এসে সরেজমিন দেখে মন্তব্য লিখে গেলেন যে বানরটিকে বানরের জন্য আদর্শ খাবার দেয়া হয় নি। চিড়িয়া খানায় রাখলে সেখানকার ডাক্তারগণ বানরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নির্ধারিত খাবার সরবরাহ করেন। এই বানরটি অতিরিক্ত কলা খেয়ে অতিরিক্ত ওজনপ্রাপ্ত হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন স্বাস্থের জন্য ভাল না। বানরটিকে চিড়িয়াখানায় হস্তান্তর করা হউক।

প্রিন্সিপাল সাহেব চিড়িয়াখানার প্রধান কিউরেটরকে লিখলেন বানরটিকে নিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য। চিড়িয়াখানা থেকে সহকারী কিউরেটর এলেন বানরটিকে দেখতে। তিনি প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করে বিস্তারিত আলোচনা করে তার মন্তব্য পেশ করলেন। তিনি জানালানে তার অভিজ্ঞতার কথা এভাবে।

আমি গত তিন বছর যাবৎ চিড়িয়াখানায় চাকরী করছি। বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। চিড়িয়াখানায় জন্মগ্রহণ করে যেসব বানর বড় হয় সেগুলি নিয়ে কোন সমস্যা নাই। সমস্যা হয় যদি বন থেকে অথবা কারো দান করা পোষ্য বানরকে চিড়িয়াখানায় আনা হয়। আগুন্তুক বানরকে চিড়িয়াখানার বানররা সহ্য করতে পারে না। সুযোগ পেলে দলবদ্ধ হয়ে আগুন্তুক বানরকে কিলিয়ে মেরে ফেলে। আমি এরকম ঘটনা চারটি দেখেছি। এর উল্টাটাও হয়। পোষ্য বানর বড় করে বনে ছেড়ে দিয়ে দেখা গেছে বনের বানররা তাকে কিলিয়ে মেরে ফেলেছে।

চিড়িয়াখানার আসে পাসে কিছু পলাতক বানর থাকে। তাদেরকে বন্য প্রাণী হিসাবে গণ্য করা হয়। সুযোগ পেলেই তারা চিড়িয়াখানার দর্শকদের খাবার ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। একবার এক উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর হাত থেকে চিড়িয়াখানার আসে পাসের বন্য বানর ছোঁ মেরে কলা নিয়ে লাফিয়ে গাছে উঠে যায়। সাথে তার ওড়নাও নিয়ে নেয়। কর্মকর্তা আমাদের বিরূদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা বেশ সমস্যায় পড়ি। কাজেই চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইন অনুযায়ী বানরটিকে হয় বনে ছাড়তে হবে না হয় চিড়িয়াখানায় দান করতে হবে কাগজ পত্রের মাধ্যমে। চিড়িয়াখানায় দিতে হলে থানার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিতে হবে কোর্টের অর্ডার নিয়ে। সে ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিতে হবে। চিড়িয়াখানায় পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা তা দেখতে হবে। নতুন একটি খাঁচা তৈরি করতে হবে। তারপর এর জন্য খাদ্য বরাদ্দ নিতে হবে। সব কিছু কমপ্লিট করে তারপর বানরটিকে নেয়া যাবে। এতে কয়েকমাস লেগে যাবে। কাজেই আমি দুইটি অপশন দিয়ে আমার রিপোর্ট দিয়ে গেলাম। এখানে লেইলার মতামতেরও গুরুত্ব দিতে হবে মানবিক কারনে। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হলেও তার মানষিক দিকটাও দেখতে হবে। সে বিদেশী মেয়ে। অনেক মায়া মমতা করে বানরটিকে পোষছে। যেহেতু বাংকু বানরটিকে গরাণ বন থেকে এনেছিল সেই বনেও ছাড়া যেতে পারে। ছাড়লেও কিছুদিন বনরক্ষী দিয়ে একটু পাহাড়ায় রাখতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে বন্য বানরদের সাথে তার বন্ধুত্ব হতে পারে।

এবার প্রিন্সিপাল সাহেব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টরকে লিখলেন বানরটাকে বনে অবমুক্ত করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য। তিনি গরাণ বনের প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাকে পাঠালেন ব্যাপারটা দেখার জন্য। তিনি এসে সব জেনে অধ্যক্ষ সাহেবকে জানালেন যে বানরটি নেয়া যাবে। তবে বিচার বিভাগের অনুমতি লাগবে। পৌঁছিয়ে দিতে পুলিশের সহায়তা লাগবে।লেইলা যদি দিতে অস্বিকৃতি জানায় তখন মানবিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। আমি জেনেছি বানরটি নিয়ে বিভিন্ন বিভাগ থেকে যেভাবে তদন্ত হচ্ছে তাতে সে বানরটাকে হারাতে পারে। তাই সে ভেংগে পড়েছে। মেয়েটা বিদেশী। একাকী থাকে। মাংকুকে ছেলের মত স্নেহ করে। মন খারাপ করে যদি আত্বহত্যার পথ বেছে নেয়! কাজেই মানবাধিকার কর্মীর সাথে একটু পরামর্শ করা যেতে পারে। অধ্যক্ষ সাহেব মানবাধিকার কর্মীর কাছে চিঠি পাঠালেন। লেইলা কিছুতেই মাংকুকে ছাড়তে রাজি ছিল না। মানবাধিকার কর্মীরা লেইলার পক্ষ নিলেন। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করল।

বিকেলে লেইলা কুমারী নদীর তীরে গিয়ে কিছুক্ষণ বসল। স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট নৌকাতে অনেকে নৌবিহার করছিল। মাঝে মাঝে জেলেরা জাল টেনে মাছ ধরছিল। কিছু কিছু নৌকা মাল বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছিল যেন ডুবে ডুবে ভাব। এই সময় কুমারী নদীতে তেমন স্রোত ছিল না। নদী থেকে মৃদুমন্দ হাওয়া এসে গায়ে লাগছিল। ইরানের কারুন নদীর দৃশ্য তার মনে পড়ল। ধীরে ধীরে মনে পড়তে লাগল তার শৈশবের স্মৃতি, মায়ের কথা, বাবার কথা, বোনদের কথা। এই সময় তার বাবা ইরানের জেলখানায় অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে আছে। কার জন্য তার বাবা রাজনীতি করেন? এমন রাজনীতি করছেন যে তাকে সারাজীবন পরিবার ফেলে জেলে পঁচতে হবে। তদন্তকারীরা যা শুরু করেছেন তাতে হয়ত মাংকুকে হারাতে হবে। এসব ভেবে লেইলার চোখ বেয়ে যেন কুমারী নদীর পানি বয়ে যায়। সন্ধার অন্ধকার নেমে আসে। ফিরে আসে হোস্টেলে। মাংকুর দিকে চেয়ে থাকে। মাংকুও চেয়ে থাকে লেইলার দিকে। মাংকু বুঝতে পারে তার মমতাময়ী মায়ের মন ভাল নেই। কিন্তু কেন ভাল নেউ তা বুঝতে পারে না।

প্রিন্সিপাল সাহেব লেইলাকে ডেকে পাঠালেন। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রিপোর্ট জানালেন। এখন লেইলার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন।
: স্যার, আমি বাংলাদেশকে ভাল বাসি। বাংলাদেশের আইন বিরোধী কোন কাজ আমি করব না। আমি বুঝতে পেরেছি আমি যা করেছি তা অন্যায় হয়েছে। বানরটি এবং বানরের মালিক বাংকুকে দেখে আমার মায়া হয়েছিল। বাংকুকে আমি কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করে দিয়েছি। ও একটা দোকান করে। বিয়ে করেছে। বাচ্চা হয়েছে। সে এখন ভাল আছে। সেও তার সন্তানের মত মাংকুকে স্নেহ করতো। এখনো মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়। আমিও মাংকুকে সন্তানের মত স্নেহ করি। আইনে যা আছে তা আমি মেনে নেব, স্যার। যদি মাংকুকে অবমুক্ত করতেই হয় তবে আমার একটা অনুরোধ থাকবে আমি যেন তাকে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতে পারি।
: হোস্টেলে গোপনে বন্য প্রাণী পোষ করে তুমি আমাদের প্রতিষ্ঠানের মস্তবড় বদনাম করেছ। এরজন্য কলেজ প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। পৌরসভাও জানতে চেয়েছে তাদের কাছে না জানিয়ে কেন বন্য প্রাণী পৌরসভার ভিতরে পালন করা হচ্ছে। তোমার বিরুদ্ধে আমরা ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য মেডিকেল এডুকেশনের ডাইরেক্টর সাহেবকে লিখেছি। তোমার ছাত্রত্ব হয়ত বাতিল হবে এবার। তুমি বার বছর যাবৎ মেডিকেলে পড়ছ। এরপর থেকে হয়ত আর পড়তে হবে না। আর কষ্ট করতে হবে না।
: স্যার, আমি এখন থেকে পড়ায় মনযোগী হব। আমাকে ডাক্তার হতে সহযোগীতা করুন।
: তোমার ব্যাপারে ইরান এম্বেসীতে চিঠি দেয়া হয়েছে। খুব সম্ভব তোমার ভিসা বাতল হয়ে যাবে। তুমি আর বাংলাদেশে থাকতে পারবে না। এখন হোস্টেলে যাও। কাগজপত্র থানায় জমা দিতে হবে আজই। থানা থেকে আদালতে অভিযোগ যাবে খুব সম্ভব। আদালত যেভাবে রায় দেয় সেভাবে অগ্রসর হতে হবে।

থানা থেকে আদালতে মামলা করা হল। মামলার শুনানি হতে লাগলো বিভিন্ন তারিখে। দুই মাস পর আদালত রায় দিল যে মাংকুকে তার জন্ম ভুমি গরাণ বনে অবমুক্ত করতে হবে। করা নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পুলিশ প্রহরায় মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ গরাণ বনে মাংকুকে নিয়ে যাবেন। সাথে লেইলাও যাবে। বনরক্ষীদেরকেও নির্দেশ দেয়া হল মাংকুকে বন্য বানর থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। লেইলাকে পারমিশন দেয়া হল যে সে বনে গিয়ে মাংকুকে খাওয়াতে পারবে বনরক্ষীদের উপস্থিতিতে।

একদিন শনিবার কলেজ কর্তৃপক্ষ পুলিশ প্রহরায় মাংকুকে নিয়ে একটি পিকআপ ভ্যানে করে গরাণ বনের দিকে রওনা দিলেন। লেইলাও সাথে গেলো। গরাণ বনের জিগাতলা পয়েন্টে বন কর্মকর্তার নিকট বানরকে হস্তান্তর করা হল। বন্য বানরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য আপাতত লম্বা শিকল দিয়ে গাছে বেধে রাখা হল পাহারার ব্যাবস্থা করা হল। বিদায় বেলায় লেইলা মাংকুকে আদর করল।

এদিকে মাংকুকে হারিয়ে লেইলা ভেংগে পরল। মেডিকেল এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এলো। ইরান এম্বেসি থেকেও কারন দর্শানোর নোটিশ এলো। তাতে লেইলা আরো ভেংগে পরল। মাঝে মাঝে কলা ও আপেল নিয়ে লেইলা মাংকুকে দেখতে যেতো। সে লক্ষ করছিল ক্রমে ক্রমে বন্য বানরেরদের সাথে মাংকুর বন্ধুত্ব বেড়েই চলেছে। এক সময় লক্ষ করল মাংকু এক বউ যোগার করে ফেলেছে। দেখে লেইলার ভাল লাগলো। বনরক্ষীরা মাংকুর শিকল খুলে দিয়েছে। মুক্ত থাকলেও মাংকু জিগাতলার আশেপাশেই থাকত। এক সময় মাংকুর এক মেয়ে বাচ্চা হল। লেইলা দেখলো বাচ্চাকে কোলে নিয়ে মাংকু গাছে গাছে আনন্দে লাফা লাফি করছে। এইবার লেইলার বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা তাকে কতবার ছোটবেলা কাঁধে মাথা রেখে ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পারিয়েছেন।

এদিকে লেইলার সব কিছু ফাইনাল হয়ে গেল। মেডিকেল এডুকেশন থেকে নির্দেশ এলো তার ছাত্রত্ব বাতিলের। এম্বেসি থেকে নির্দেশ এল তাকে ইরানে ফিরে যেতে। এবার মাংকুকে শেষবার দেখে লেইলা ১৩ বছরের মেডিকেল লাইফের ইতি টেনে নিজ দেশ ইরান চলে গেল।

ইরান ফিরে গেলেও তার মন পরে থাকত বাংলাদেশে। ওখানে গিয়েও তার কোন কিছু ভাল লাগতো না। এক বিকেলে সে ইরানের কারুণ নদীর তীরে গিয়ে বসল। নদীতে ছোট ছোট ছোট নৌকা ভাসছিল। লেইলা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছিল। দেখতে দেখতে এক সময় হারিয়ে গিয়েছিল স্মৃতির অতল গভীরে। সে দেখতে পেল যেন বাংলাদেশের কুমারী নদীর মনোরম দৃশ্য। মনে পরল ফেলে আসা সন্তানতুল্য এক বন্য বানর মাংকুকে। অশ্রু কপোল বেয়ে পরল মাটিতে। লেইলার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর করার কিছু ছিল না। ইরানী মেয়ে সেই লেইলার।


==
বি:দ্র: এই গল্পের সকল চরিত্র, স্থান এবং ঘটনা কাল্পনিক।
কাট পেস্ট করবেন না, অনুগ্রহপুর্বক।
ভাল লাগলে শেয়ার করুন।
==
৩০/৫/২০১৮



সুচিপত্র