আমার নাটকের প্রতি আগ্রহ
(
স্মৃতির পাতা থেকে)
১৯৬৩ সন হতে পারে। আমার বয়স তখন / বছর হবে। রৌহা নানাবাড়ি ছিলাম। বিকেলে হালট পাড়ে তেতুল গাছের পাশের খেতে গোদুল্লা খেলছিলাম। এক সময় আমার চেয়েও সামান্য ছোট আমার এক মামাতো বোন বলল "মাষ্টর দাদার এডুতে আইজকা আইতে টাটক অব।" অর্থাৎ রাতে আমার ছোট নানা কাজীম উদ্দিন মাষ্টারের রেডিওতে নাটক হবে। নাটককে সে টাটক বলেছে। আমিতো তাও জানি না। যাহোক রাত দশটায় বাড়ীর সবাই নাটক দেখতে বসে পরলাম উঠানে পাটি বিছিয়ে। কাশেম মামা আমার চার বছরের বড়। তিনি বিষয়গুলি মাঝে মাঝে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের কালজয়ী নাটক মধুমালা। সেই নাটকের ঘটনা আমার মনে নেই। তবে নাটককে টাটক বলায় আমরা তাকে অনেকদিন পর্যন্ত ঠাট্টা করেছি। আরো কারো মনে আছে কিনা জানি না

বাড়ী এসে আরেকদিন একটি নাটক শুনলাম খসরু কাক্কুর রেডিওতে। নাটকের নাম বেদের মেয়ে। এটিও কবি জসীম উদ্দিনের কালজয়ী নাটক। এইবার নাটক কিছুটা বুঝলাম। নাটকে বেদেরা নাও চালানোর সময় গান গাইছিল "ওরে চল বেদে, চল।" মিউজিকের শব্দে মনে হচ্ছিল যেন রেডিও ভেংগে যাবে। প্রতি বছর জসীম উদ্দিনের জন্মদিনে তার এই নাটক দুইটির একটি শুনানো হত। তার মৃত্তুর পর একটি নাটক জন্মদিনে এবং একটি নাটক মৃত্তুদিনে শুনানো হত। আমি সব সময় শুনতে চেষ্টা করতাম

ছোট সময় আমাদের এলাকায় অনেক বেদে আসত। পুরুষ বেদেরা সাপ খেলা দেখাত। যাদু দেখাত। পাখি শিকার করত। মেয়ে বেদেরা দাতের পোকা খসাত। ব্লেড দিয়ে চামড়া কেটে শীংগা দিয়ে চুষে বাতের বিষ নামাত মন্ত্র পড়ে পড়ে। সান্দার্নি মেয়েরা চুড়ি বিক্রি করত বাড়ি বাড়ি ঘুরে। সান্দাররা ছাতা মেরামত করত। তাদের জীবন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তারা সবাই সরদারের নিয়ন্ত্রনে থাকত। এলাকার মাতাব্বর ছাড়া তারা কাউকে ভয় পেত না। সেই বেদেদের জীবন যাপন করুন কাহিনী বেদের মেয়ে নাটকে জসীম উদ্দিন ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই নাটক আমার হৃদয় ছুয়ে গিয়েছে। সেই নাটকে খুব সম্ভব কেরামত মওলা মাতাব্বরের অভিনয় করেছিলেন। নিনা হামিদের কন্ঠে বেদের মেয়ের করুন গান গুলি হৃদয় ছুয়ে যেত। মহিলা শ্রোতাদের ফুফিয়ে ফুফিয়ে ক্রন্দন ঘোমটার ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসত নাটকের সময়

মধুমালা নাটকে মধুমালা মদন কুমার ছিল প্রধান চরিত্র। নিঃসন্তান রাজার অনেক কষ্ট ছিল সন্তান না থাকার কারনে। রাজ্যের সকল গণক দিয়ে গণণা করা হয় তার সন্তান হবার সম্ভাবনা আছে কিনা। একে একে সব গণক চলে যায় রেজাল্ট প্রকাশ না করেই। সর্বশেষ অবহেলিত এক গণক আমতা আমতা করে গণনা করে বলতে থাকে "হি হি হি, হি হি হি, হি হি হি "
উজির বলে " কি শুধু বলে যাচ্ছ হি হি হি, কিছু পেয়েছ, সন্তান হবে, রাজা মশাইয়ের?"
গণক -পেয়েছি, পেয়েছি, পেয়েছি, হি হি হি।
নাজির - কি শুধু হি হি করছ। কি পেয়েছ তাই বল।
রাজা - গণক, কি পেয়েছ, তাড়াতাড়ি বল। আমার সন্তান হবে?
গণক - হি, হি হি, হা হা হা, হায় হায় হায়।
রাজা - হি হি, হা হা থেকে হায় হায় করছ কেন?
গণক - হায় হায় হায়।
-
কি শুধু হায় হায় করছ। খুলে বল।
-
নির্ভয়ে বলব?
-
বল নির্ভয়ে।
-
রাজা মশয়ের ছেলে সন্তান হবে। কিন্তু!
-
কিন্তু কি? তাড়াতাড়ি বল।
-
রাজা মশয়ের ছেলে হবে। কিন্তু তাকে বার বছর সুর্যের মুখ দেখানো যাবে না। দেখালে মারা যাবে।
আনিস এত সুন্দর করে গণকের অভিনয় করতেন যে আমার খুব ভাল লাগতো।
একবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাইরেক্টর স্যারের বাবার গলার একটি নমুনা কলেজ প্যাথলজি ল্যাবে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়। ইম্পোর্টেন্ট রুগীর পরীক্ষা তাই খালি চোখে পর্যবেক্ষণ করার সময় আমার ডিপার্টমেন্ট-এর প্রধানকে সাথে রাখলাম। কাটার সময় মনে হল টিবি হয়েছে। স্যার ডাইরেক্টর স্যারকে ফোন করলেন "চিন্তা করবেন না, স্যার। আপনার বাবার টিবি হতে পারে।" তিনদিন পর স্লাইড মাইক্রোস্কোপি করে পাওয়া গেল ক্যান্সার। তখন স্যার আবার ফোন করলেন "স্যার, সরি স্যার, আপনার বাবার টিবি না, ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসা করলে ভাল হয়ে যাবে। " আমি মনে মনে বললাম "হা হা থেকে হায় হায় হয়ে গেল।" আমার ছোট মেয়ে দীনা যখন সরকারি মেডিকেল কলেজে এম বি বি এস- চাঞ্চ পেলো তখন আমার মনের ভিতর আনন্দে হা হা করছিল। একদিন পরেই খবর পেলাম আমাকে ময়মনসিংহ থেকে দিনাজপুর বদলী করা হয়েছে। আমার মনে দু:খে হায় হায় করা শুরু করল। বারবার মধুমালা নাটক মনে হচ্ছিল

বড় হয়ে মদন কুমার সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে বনে শিকার করতে সপ্তডিংগা মধুকর নৌকা সাজিয়ে ভিন দেশে গেল। মাঝিরা গান গাইতে গাইতে নৌকা চালাল। বেদার উদ্দিনের কন্ঠে "হেইয়ারে, হেইয়া" গানটি যেন আমি আজো শুনতে পাই। স্বপ্নে মদন কুমারের সাথে মধুমালার দেখা হল। মালাবদল করে বিয়ে হল। স্বপ্ন ভংগ হলে গান গেয়ে বন্ধুদের কাছে রাজকুমার প্রকাশ করল
-
আমি স্বপ্নে দেখলাম মধু মা লার মু গো।
-
স্বপ্ন সত্য না।
-
স্বপ্ন যদি মিথ্যা হইত মালা কেনো বদল হইল গো মালা। আমি স্বপ্নে দেখলাম মধু মা লার মুখ গো

বয়েস আমার কম। নাটক থেকে জানতে পারলাম মালা বদল করলেই বিয়ে হয়ে যায়। শিশুকালে আমরা শিমুলফুল পলাশফুল গেথে মালা বানাতাম। নাটক শুনার পর সতর্ক হতাম কেউ যেন হঠাৎ মালা পরাতে না পারে। কোন মেয়ের হাতে ফুলের মালা দেখলেই এড়িয়ে যেতাম

এরপর আসতে আসতে বড় হতে থাকি। রেডিওতে নিয়মিত সাপ্তাহিক নাটক শুনতে থাকি। ভাল লাগে। বড়রা গ্রামের স্কুল মাঠে নিজেদের অভিনয় করা মঞ্চনাটক দেখে এসে গল্প করে। যেতে ইচ্ছে হয়। আমি ভাল ছাত্র ছিলাম। রাত জেগে নাটক দেখতে যাওয়া আমার মানাত না। তাই আমি রাতে বাংলা ঘরে শুইয়ে কিছুক্ষণ নাক ডেকে উঠে চুপি চুপি নাটক দেখতে যেতাম। আমার বাড়ির কেউ জানতেন না। তখন আমি হাই স্কুলে পড়ি। কালিয়া বাজার তখনো জমে উঠে নি। ওখানে একটা মঞ্চ নাটক হল। আমরা বলতাম ড্রামা। শীতের রাত ছিল। বাচরা খেতে জাম্পার, টুপি চাদর গায়ে দিয়ে লেটা দিয়ে বসলাম। নরম ঘাসওয়ালা মাঠকে বলতাম বাচরা খেত। ঘাসে এক প্রকার কাটা ছিল যেগুলি জামা কাপড়ে আটকে যেত। আমরা বলতাম বাইটা বাচরা। শহুরে মানুষ বলত প্রেমকাটা। মেয়েরা ড্রামা দেখতে যেতে পারত না। অভিনয় করার জন্য মেয়েরাও অনুমতি পেত না। চৌকি ফেলে নাট্যমঞ্চ তৈরি করা হইত। নাটকে দেখলাম নায়ক নায়িকা কথা বলছে। কথা বলতে বলতে একজন যখন ডান দিকে যান আরেকজন তখন যান বাম দিকে। রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখাতে একটি গাছের ডাল ফেলে রাখা হয়েছে মঞ্চে। সেই ডালে বসে তারা প্রেমের কথা বলছে। এক সময় দেখা গেল নায়িকা বিচ্ছিরিভাবে চুলকাচ্ছে। জর্জেট শাড়ী পরা। মাথায় পরচুলা লাগানো। পাউডার দিয়ে মুখ ফরসা করা হয়েছে। হেজাকের আলোতে আরো ফর্সা লাগছে। পাশের এক দর্শকের কাছে বললাম "এতগুলি ছেলের সামনে মেয়েটা কিভাবে চুলকাচ্ছে!" সে বলল "ইনিতো মেয়ে না, ছেলে। মেয়ে সেজেছে। তাই সে লজ্জা পাচ্ছে না। "
এভাবে আমি কয়েকটি ড্রামা দেখেছিই, কাদের নগর, কচুয়া, কালিয়ান বাতাজোরের কথা মনে আছে। মেধাবী ছাত্র আরাইপাড়ার কদ্দুছ ভাই নিজেই বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না নাম দিয়ে একটি নাটক লিখে নিজের পরিচালনায় কচুয়া প্রাইমারী স্কুল মাঠে মঞ্চস্থ করেছিলেন। কাশেম বয়াতির ভাতিজা হাশেম জ্যোৎস্নার চরিত্রে খুব ভাল অভিনয় করেছিল। তার একটা চমৎকার ডায়ালগ ছিল "অরে আমার আবাজাবা, অই মুখে আবার বাতাসা খাবা?" শুনে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম কিশোর বয়সে। ১৯৭৩ সনের দিকে কচুয়ার দক্ষিণ পাড়ায় একটা খুব ভাল ড্রামা হবার কথা ছিল। আমরা গেলাম। জানলাম আজ ড্রামা হবে না। কেন হবে না তা আমরা জানতে পারলাম। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে জানতে পারলাম দেওয়ান বাড়ির পাশের বাড়িতে রাতে একটা খুন হয়েছে। আমরা দল বেধে লাশ দেখতে গেলাম। দেখলাম উগারের নিচে লাশটি পরে আছে। পেটের ছিদ্র দিয়ে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আছে। বল্লম দিয়ে হয়ত ঘা দিয়েছিল। বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি খুনিরাই হয়ত নির্বিঘ্নে খুন করার জন্য ড্রামা বন্ধ করেছিল।

এলাকায় সাধারণ দর্শকদের বিনোদনের জন্য গীতিনাট্য মঞ্চস্থ হত। সাড়াসিয়ার গভীরা হাটে, কালিয়ার নুতুন হাটে, কির্তনখোলায় আমি কয়েকটি গিতিনাট্য উপভোগ করেছি। একটির নাম ছিল ঘাটু গান। এখানে নেচে নেচে গান গেয়ে গেয়ে ঘাটু অভিনয় করত। ঘাটুর অভিনয় করত একটি ছেলে। মাথায় মেয়েদের পরচুলা, গায়ে ছেলেদের সেন্ডো গেঞ্জি, ডান হাতে রুমাল, পরনে কুচি দিয়ে জর্জেট শাড়ী লেহেংগার মত করে পড়া পায়ে ঘুঙুর। মাজায় বাম হাত রেখে, ডান হাতে রুমাল ঝুলিয়ে গাইত "আমরা জলে যাইওল কমলা, আমরা জলে যাই/ আমার যমুনার জল দেখতে ভাল চান করিতে লাগে ভাল/ নিহরে ভিজিল শাড়ী, গামছা কেন বিছাও না" ইত্যাদি। আলোমতি নামে একটা গীতি নাট্য দেখেছি। সেখানে নায়ক পানি খেতে এক বাড়িতে যায়। বাড়িতে নায়িকা আলোমতি একা ছিল। এই রকম গানের ডায়ালগ ছিল :
নায়ক গাইছে-
জল খা ইতে গিয়া ছিলাম দিন ভিখারির বাড়ি
কে যেন জল এনেদিল মানুষ কিংবা পড়ী রে
মন ছুটে যায় তাহার লাইগারে!!
.....
নায়িকা গাইছে-
আমার মাতা পিতা চাকরি করে মহাজনের বাড়িরে
আমি আলো একা বাড়ি থাকি।
......
এইসব ডায়ালগগুলি তখন খুব ভাল লাগতো। ছোট দাদা খামার দেখতে গিয়ে পিপাসার্ত হয়ে এক গরীব বাড়িতে গিয়ে পানি চেয়েছিলেন। বাড়িতে কেউ ছিল না। শুধু এক সুন্দরি মেয়ে ছিল। তিনি নিজেই ঘুমটা দিয়ে এসে পানি দিয়েছিলেন। দাদা তাকে দেখে মুগ্ধ হন এবং অল্প আলাপে জানতে পারেন তিনি বিদবা। দাদা দাদীর অমতেই সেই সুন্দরি মেয়েকে বিয়ে করেন। আলোমতি নাটকের ঘটনা থেকে আমি আমার ছোট দাদার মনের অবস্থাটা কল্পনা করতাম।
১৯৭৪ সনে আমি ৮ম শ্রেণীতে পড়তাম। মোতালেব ভাইর সম্বন্ধী লেবু ভাই চারবার রুপবান নাটক দেখেছেন। তিনি বলতেন "রুপবানের যে অভিনয় করে সে হল একজন উপজাতি ছেলে। তার চেহারা কন্ঠ মেয়ের মত। দেশে তার আপন কেউ নেই। সবাই তাকে ফেলে ভারত চলে গেছে। গান গাইতে গাইতে ঠাসঠাসি মঞ্চে পরে যায় খুবই করুন। " তাই, খুব ইচ্ছা হল রুপবান গীতি নাটক দেখার। এক রাতে চুপি চুপি তার সাথে কির্তন খোলায় রুপবান নাট্ক দেখতে গেলাম। নাটক শুরু হয় নাই। পিছনে একটি ঘরে দরজা লাগিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রিহার্সেল দিচ্ছে। লেবু ভাই বললেন আস রুপবানকে দেখিয়ে দেই। ঘরের সাইডের পিড়ির উপর দাড়ালাম খোলা জানালার শিক ধরে। দেখলাম রুপবান মেঝেতে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাবরি চুল দুলিয়ে দুলিয়ে গানের রিহার্সেল দিচ্ছে। দেখে গর্বিত হলাম। এরপর যথাসময়ে নাটক শুরু হল। ঘটনাক্রমে ১২ দিন বয়সের রহিমের সাথে ১২ বৎসর বয়সের রুপবানের বিয়ে হয়। রুপবানকে স্বামী সহ বনবাসে দেয়া হয়। নানা রকম বিপদ আপদের মধ্য দিয়ে রুপবান শিশু স্বামীকে নিয়ে বনে কাটান। বনের রাক্ষস রাজা তাকে পিতার মত করে বিপদ থেকে রক্ষা করে। রাক্ষস রাজা গান গেয়ে রুপবানকে উপদেশ দেন
"
মা তুই এপথ দিয়ে চল।
ঐপথ দিয়ে চললে পরে
পরবি রে তুই বিষম ফেরে
ভয় কি রে তাই বল, অল অল অল
মা তুই এই পথ দিয়ে চল। "

রুপবানের দুখের কাহিনী গুলি গানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। রুপবান দুই কলি করে গান গায়। মঞ্চের পাশে তিনজন পাইল দোহারি সেই গানের কলি রিপিট করে আর হারমোনিয়াম তবলা বাজায়। এক জনের কন্ঠ ঘাড়, একজনের কন্ঠ মধ্যম আরেকজনের কন্ঠ মেয়েলি

শিশু স্বামীকে শুইয়ে রেখে নদীতে পানি আনতে যাওরার আগে রুপবান গায়
"
প্রাণ পতি গো আমি কোন বা প্রাণে তোমায় রেখে যাই......"
শিশু স্বামীকে ঘুম পাড়ানোর জন্য রুপবান গায়
"
ঘুমাওরে পরানের বন্ধু ঘু মাও রে।
ডাক ডাকে ডাকিনি ডাকে রে,
কুকিল ডাকে রইয়া,
নিদারুন কুকিলারে ডাকে, আয় আয় রে!
ঘুমাওরে পরানের বন্ধু, ঘু মাওরে।
বাতাস দেই তোর গায় রে
বন্ধু ঘু মাওরে। "
বালক স্বামীকে উপদেশ দিয়ে দিয়ে রুপবান গায়
"
নদীতে না যাইও রে,
বইধু , নদীতে না যাইও রে
ঐনা নদীর ঘোলারে ঘোলা পানি। "
বড় হলে বনবাস থেকে রুপবান লোকালয়ে ফিরে আসে। রহিম স্কুলে ভর্তি হয়। ক্লাসমেট তাজেলের প্রেমে পরে। তাজেলকে উদ্দেশ্য করে রুপবান গায়
"
শোন, তাজেল গো, মন না জেনে প্রেমে অইজ না।
আমি করি বন্ধুর গো শা
তুমি তাজেল র্বনাশা
এত জ্বালা আর প্রাণে অহে না।
মন না জেনে প্রেমে অইজ না। "

স্বামী রহিম রুপবানকে ছেড়ে যায় তখন রুপবান গায়
"
বন্ধুরে রাণের বন্ধু
বন্ধু যাইও না ছা ড়িয়া।"

"আগে যদি জানতাম বন্ধু যাইবা রে ছাড়িয়া
দুই রন বান্ধিয়ারে রাখতাম মাথার কেশ দিয়া রে
বন্ধু বিনোদিয়া।
আমার প্রাণ বিনোদিয়া রে মন বিনোদিয়া। "
যে স্বামীকে এত কষ্ট করে ১২ বছর বনে বড় করল সেই স্বামী রুপবানকে ভুলে গিয়ে তাজেলকে ভাল বাসল। আমার কিশোর বয়সে এই কাহিনী বেশ মনে দাগ কেটে যায়।

যখন আলাউদ্দিন সিদ্দিকী কলেজে পড়ি তখন শুনলাম বল্লা বাজারে বাংলাদেশের বিখ্যাত যাত্রা দল বলাকা অপেরা যাত্রা অভিনয় করতে এসেছে। এটা প্রিন্সিপ্যাল এফ এম গোলাম কিব্রীয়া স্যার জয়েন করার আগের ঘটনা। আমরা কয়েকজন রাতে যাত্রা দেখতে গেলাম। দেখলাম সামনের সারিতে আমাদের দুইজন স্যার বসে আছেন। ভয় কমে গেল। স্যার যখন আছেন তখন এটা খারাপ হবার কথা না। এইবার প্রথম সরাসরি নায়িকার চরিত্রে মেয়ের অভিনয় দেখলাম। এর আগে নায়িকা চরিত্রে পুরুষের অভিনয় দেখেছি। যাত্রায় ভিন্ন ধরনের অভিনয় দেখার অভিজ্ঞতা হল। বিবেকের গাওয়া উপদেশমুলুক গানগুলির কথা সুর ভাল লাগলো। বিবেক গাইল
"
ভুল করে ফুলের মালা
পরেছিস গলে...."
নৃত্য শিল্পী নজরুলগীতি গাইল
"
রুমা ঝুম
ঝুম ঝুম নুপুর বাজে
আসিল রে প্রিয় আসিল রে
রুমা ঝুম!!"

এই গান আমি রেডিওতে অনেক শুনেছি। কিন্তু মনে হল নজরুল এই ভাবে যাত্রার জন্য গাইতেই গানটি তৈরি করেছিলেন। এরপর আমি আর যাত্রা দেখি নি।
স্কুল কলেজে পড়ার সময় সবসময় আমি রুমে আমি একটি রেডিও রাখতাম। শিক্ষামুলক অনুষ্ঠান, খবর, গান নাটক শুনতাম পড়ার ফাকে। অনেক নাটক শুনেছি। সেইসব নাটকে আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসি মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, রাইসুল ইসলাম আসাদ, কেরামত মওলা, মোহাম্মদ জাকারিয়া, আব্দুল আজিজ, ডেইজি আজিজ প্রমুখ শিল্পী অভিনয় করেছেন। সাপ্তাহিক নাটক শোনার জন্য এক সপ্তাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম

মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় প্রতিদিন এক ঘন্টা টেলিভিশন দেখতাম। তারমধ্যে বেশীভাগ সময়ই ছিল সাপ্তাহিক ধারাবাহিক নাটক। সকাল-সন্ধা নামে একটা ধারাবাহিক নাটক দেখতাম টিভিতে খুব ভাল লাগত। আফ্রোজা বেগম খুব দায়িত্বশীল একটা বউয়ের অভিনয় করতো। তার চরিত্রটা আমার খুব ভাল লাগতো। তার নামে আমার ভাতিজির নাম রেখেছিলাম আফ্রোজা। সে মনে হয় জানে না। আরেকটা ধারাবাহিক নাটক দেখতাম ঢাকায় থাকি। শহরের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত ফ্যামিলিগুলির জীবন যাপন দেখতে পেতাম এই নাটকে। অনেক কিছু শিখতে পেতাম। ভাল লাগতো। এরপর হুমায়ুন আহদের জনপ্রিয় কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক আমি নিয়মিত টিভিতে দেখেছি। তারমধ্যে ছিল অয়ময়, বহুব্রীহি, আজ রবিবার, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি। সেলিম আল দিন রচিত ভাংগনের শব্দ শুনিও খুব ভাল লাগতো। আসকার ইবনে শাইখের ধারাবাহিক নাটক আমি দেখেছি কিন্তু সেই নাটকের নাম আজ মনে নেই। শহিদুল্লাহ কায়সার রচিত ধারাবাহিক সংশপ্তক নাটকও আমি দেখেছি নিয়মিত। ১৯৯৩ সনে যখন আমি এম ফিল পড়ি তখন টিভিতে হুমায়ুন আহমেদের শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক কোথাও কেউ নেই চলছিল। শত পড়ার চাপের মধ্যেও আমি এটা দেখতাম। এই নাটকে সব উলটা কারবার। অফিসের তিন লাখ টাকা চুরির সাথে জরিত লোকটিও নাটকের অন্যান্য চরিত্র দর্শকের কাছে ভাল ভাল লাগে। পাড়ার বড় মাস্তান বাকেরকেও সবার কাছে ভাল লাগে। বাকের চায়ের দোকানে বসে বসে পঞ্চাশের দশকের সামসাদ বেগমের গাওয়া "হাওয়ামে উড়তা যায়ে লাল দোপাট্টা মল মল" গানটি শুনত। গানটি আমার আগে থেকেই পছন্দের ছিল। এই গান সাধারণত সেলুনে বাজত। একসময় আমি সেলুন কর্মীকে ক্যাসেটের দাম দিয়ে গানের পুরান ক্যাসেট কিনেছিলাম। নাটকে শেষের পর্বে বাকের ভাইর ফাসি হয়। আগের পর্বে ধারনা করা হচ্ছিল ফাসি হবে। সারাদেশের দর্শক সত্যি সত্যি ফাসির প্রতিবাদের মত প্রতিবাদ করে মিছিল করল। স্লোগান দিল "বাকের ভাইর ফাসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে। " পিজিতে বায়োস্টেটিস্টিক ক্লাশে প্রফেসর আব্দুর রহমান স্যার এনিয়ে কিছু কথা বললেন। আমি শুনতে শুনতে নাটকে চলে গিয়েছিলাম। কথাপ্রসঙ্গে স্যার আমাকে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন "তুমি বল নাটকের ঘটনা নিয়ে বাস্তবে এভাবে মাতলামি করা ঠিক?" আমি বললাম "ঠিক না, স্যার।নাটক নাটকই। নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক না। " মনে মনে বললাম "ঠিক।" হুমায়ুন আহমেদ কারো কথা না শুনে ফাসি দিয়েই দিলেন। একটা মাস্তানের জন্য সারাদেশের মানুষ কাদল। বাকের ভাইর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নুর এম পি। তার সহধর্মিণী ডাক্তার তখন আইপিজিএমআর- শিশু বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রী কোর্সে ছিলেন। মাঝে মাঝে একই লিফটে দেখা হত। কেউ কেউ আর চোখে তাকিয়ে অন্যকে চিনিয়ে দিতেন "ইনি বাকের ভাই বাস্তবের স্ত্রী, ডাক্তার, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের কোর্সে আছেন। " বর্তমান যুগের জনপ্রিয় নায়ক চঞ্চল চৌধুরীর সহধর্মিণীও ডাক্তার। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে একদিন এনাটমি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। টিচারগন গর্বকরে বলছিলেন আজ নায়ক চঞ্চল চৌধুরীর স্ত্রীর পরীক্ষা নিলাম। এম বি বি এস না পোস্টগ্রাজুয়েট আমি জানি না।
ইদানিং রাত দশটা পর্যন্ত চেম্বারে থাকতে হয়। তাই টিভি নাটক সাধারণত দেখা হয় না। আনিসুল হক রচিত, মোশারফ করিম অভিনিত টিভি নাটক আমার খুব ভাল লাগে। অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য ভালভাবে দেখতে পাই না। জাহিদ হাসান, সমি কায়সারের,অপুর্ব, মেহজাবিন এদের অভিনয় ভাল লাগে।

স্বপ্না সব সময়ই আমার পছন্দকে গুরত্ব দেয়। আমি সারাক্ষণ কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকি সে পছন্দ করে না। বলেও বেড়ায় "সারাক্ষণ কম্পিউটার, মোবাইল টেপা আমার ভাল লাগে না। আমার কাছে অসহ্য লাগে। " কিন্তু দেখা যায় কম্পিউটার-এর উপর যে কোন লিখা পেপারে থাকলে আমার জন্য আলাদা করে রেখে দেয়। জানে যে আমি এটা পড়ে খুশী হব। বাসায় ব্রডব্যান্ড হাই স্পিড ইন্টারনেট লাগিয়ে রাউটার দিয়ে কম্পিউটার, মোবাইল স্মার্ট টিভিতে ওয়ারলেস ইন্টারনেট কানেকশন দিয়েছি। ইচ্ছা হলেই পছন্দের নাটকগুলি ইউটিউব থেকে দেখে নেই অবসর সময়ে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বেশী দেখা হয় না। ইউটিউব বেশী দেখা হয়। স্বপ্না নাটক দেখে আমাকে দেখতে বলে। জানে যে এটা আমার ভাল লাগবে। দুইজনে বসে দেখি ঘুমুতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। কয়েকদিন আগে আমার সবচেয়ে পছন্দের নাটক কোথাও কেউ নেউ বিটিভি ইউটিউবে আপলোড দেয়। স্বপ্না দেখে আমাকে দেখতে বলে। আমি, স্বপ্না মেয়ে ডাক্তার দীনাসহ একসাথে বসে একটানা কয়েকটি করে পর্ব দেখি। কারন, এখানে বিজ্ঞাপন বিরক্তি নাই। ১৫ পর্ব দেখে ফেলেছি দিনে প্রতিদিন এক দেড় ঘন্টা করে দেখে। এখনো বাকের ভাইর ফাসী হয় নাই। দেখলাম মেয়েও ইন্টারেস্ট পাচ্ছে। এইসব পুরাতন নাটক দেখলে পুরাতন স্মৃতি ভেসে উঠে। সেদিন কোথাও কেউ নেই নাটকে দেখলাম কাল কাল গোল মজবুত বিদ্যুতের সুইচ নাটকের মুনার মামার বাসায়। দেখে আমাদের আগের দিনের বাসার স্মৃতি মনে পরে গেল। কারন সেগুলি আমার স্মৃতির পাতায় লিখা ছিল।
===
ডাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
২৯//২০১৮